বাঙ্গালীদের সবচেয়ে প্রাচীন পূর্বপুরুষ হলো নেগ্রিটোরা। বর্তমানে সাঁওতাল, ভীল, মুণ্ডা, হাড়ি, চণ্ডাল ও ডোম উপজাতিকে নেগ্রিটোদের উত্তরসূরী হিসেবে চিহ্নিত করা যায়। বিশেষ করে সুন্দরবন, ময়মনসিংহ ও যশোর অঞ্চলে এদের প্রভাব লক্ষ্যণীয়।
নেগ্রিটো (Negrito) হলো দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার একটি আদিম জনগোষ্ঠী। ‘নেগ্রিটো’ শব্দটি স্প্যানিশ ভাষা থেকে উদ্ভূত, যার অর্থ ‘ক্ষুদ্র নিগ্রো’। নৃবিজ্ঞানে এটি একটি নৃতাত্ত্বিক শ্রেণিবিভাগ হিসেবে ব্যবহৃত হয়। এরা মূলত আফ্রিকা থেকে আগত আধুনিক মানুষের (Homo sapiens) প্রাচীন অভিবাসী গোষ্ঠীর উত্তরসূরি, যারা হাজার হাজার বছর আগে এশিয়ায় এসে স্থানীয় পরিবেশের সাথে অভিযোজিত হয়।

নেগ্রিটো জনগোষ্ঠীর বসবাস প্রধানত গ্রীষ্মমণ্ডলীয় বনাঞ্চল ও দ্বীপ অঞ্চলে সীমাবদ্ধ। ফিলিপাইনসের আয়তা ও আগতা, ভারতের আন্দামান ও নিকোবর দ্বীপপুঞ্জের জারাওয়া, সেন্টিনেলিজ ও গ্রেট আন্দামানিজ এবং মালয় উপদ্বীপের সেমাং জনগোষ্ঠী নেগ্রিটোদের অন্তর্ভুক্ত। বিচ্ছিন্ন ও দুর্গম এলাকায় বসবাসের ফলে এরা দীর্ঘকাল ধরে নিজস্ব স্বাতন্ত্র্য বজায় রাখতে সক্ষম হয়েছে।
শারীরিকভাবে নেগ্রিটোরা খর্বাকৃতি, গাঢ় চামড়াবর্ণ এবং কোঁকড়ানো চুলের অধিকারী। সাধারণত পুরুষদের উচ্চতা ১৪০–১৫০ সেমি এবং নারীদের ১৩০–১৪৫ সেমি হয়ে থাকে। এদের এই বৈশিষ্ট্য বনজীবনের সাথে অভিযোজিত, যা চলাচল সহজ করে এবং কম শক্তি ব্যয়ে জীবনধারণে সহায়তা করে।
জীবনযাত্রার দিক থেকে নেগ্রিটোরা ঐতিহ্যগতভাবে শিকারী-সংগ্রাহক সমাজ। শিকার, মাছ ধরা ও ফলমূল সংগ্রহই তাদের প্রধান জীবিকা। সমাজব্যবস্থা ছোট ও সমতাভিত্তিক, যেখানে কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের ধারণা নেই। ধর্মীয় বিশ্বাসে তারা প্রকৃতি ও আত্মাপূজার প্রতি আস্থাশীল।
মানব ইতিহাসে নেগ্রিটোদের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। ভারত উপমহাদেশে প্রাচীন ও মধ্য প্রস্তরযুগের সংস্কৃতি বিকাশে এদের অবদান রয়েছে। তবে আধুনিক সভ্যতার বিস্তার, বন উজাড় ও বহিরাগত আগ্রাসনের ফলে বর্তমানে নেগ্রিটো জনগোষ্ঠী বিলুপ্তির ঝুঁকিতে রয়েছে